হযরত ইব্রাহিম আদহাম (রহঃ)

হযরত ইব্রাহিম আদহাম (রহঃ) প্রথম জীবনে বলখের বাদশাহ ছিলেন। পরে সর্বস্ব ত্যাগ করে তারেকে দুনিয়া হন। তিনি খোদা ভক্ত সত্যনিষ্ঠ কঠোর এবং সর্বজনপ্রিয় সাধক বুযুর্গ ছিলেন। তিনি ইমাম আবু হানিফা (রাঃ)এর সাথে প্রায়ই সাক্ষাত করতেন। হযরত জুনায়েদ বাগদাদী (রহঃ) বলিয়াছেন ” ইব্রাহিম আদহাম সেই যুগের জ্ঞানী ও বিদ্বান ব্যাক্তিগনের জ্ঞ্যান ও বিদ্যার চাবি স্বরুপ ছিলেন। কথিত আছে ইব্রাহিম একদা ইমাম হযরত আবু হানিফা (রঃ) এর সাথে সাক্ষাৎ করতে যান। ইমাম সাহেবের সহচরগন তাঁর প্রতি কিছুটা অবজ্ঞার ভাব প্রকাশ করায় ইমাম সাহেব সঙ্গীগনকে বল্লেন ” ইব্রাহিম আমাদের নেতৃস্থাণীয় এবং সম্মানের পাত্র। সহচরগন তখন জিজ্ঞাসা করল,” ইনি কিরুপে এমন সম্মানের পাত্র হইলেন?” উত্তরে ইমাম সাহেব বলেন” ইনি সর্বদা আল্লাহর এবাদতে মশগুল থাকেন আর আমরা অন্য কাজেও মশগুল থাকি।ইব্রাহিম ছিলেন বলথ এবং তৎপার্শ্ববর্তী এক বৃহৎ অঞ্চলের একজন পরাক্রমশালী বাদশাহ। যখন তার বাহন রাস্তায় বের হতোতখন সোনালী ঢাল ধারী ৪০জন আরোহী ও ৪০ জন পদাতিক সৈন্য তার অগ্রে ও পশ্চাতে চলত।
 
একদা গভীর রাতে তিনি শাহী মহলে সুসজ্জিত পালঙ্কে শুয়ে ছিলেনএমন সময় হঠাৎ অট্টালিকার ছাদ কেপে ওঠে। কার পায়ের ভারে ছাদ কেপে উঠলো তা বুঝতে না পেরে তিনি উচ্চ কন্ঠে জিজ্ঞাসা করলেন কে?” উত্তর আসল” তোমারই একজন বন্ধুআমার একটি উট হারিয়ে গেছেতার সন্ধান করছি।” বাদশাহ আশ্চর্যান্বিত হয়ে বল্লেন,” ওরে মুর্খ! অট্টালিকার উপরে উট আসবে কিভাবে?” উত্তর আসল,” ওহে অলস! স্বর্ন নির্মিত সিংহাসনে বসেবহু মুল্যবান পোশাক পরে আল্লাহতায়ালার অনুসন্ধান করছ! ইহা ছাদের উপরে উট অন্বেষন অপেক্ষা অধিক আশ্চর্য্যজনক নয় কি?” এই কথা বলেই আগন্তক অদৃশ্য হয়ে গেলেন। তাঁর এই কথায় ইব্রাহিমের অন্তরে ভয় এবং চিন্তার উদ্রেক হলো।

পর দিন সকালে আমীর -ওমরাহ বেষ্টিত ইব্রাহিম শাহী দরবারে বসে আছেনএমন সময় এক তেজস্বী পুরুষ মহাবেগে দরবারে উপস্থিত হলো। তিনি এত দ্রুত প্রবেশ করলেন যে তাকে বাধা দেয়া কারো পক্ষে সম্ভব হলো না। ইব্রাহিম আগন্তককে জিজ্ঞাসা করলেন, “তুমি কি চাও?” আগন্তক উত্তর করলেন,” আমি অল্পক্ষনের জন্য এই পান্থশালায় বিশ্রাম গ্রহণ করতে চাই।” ইব্রাহিম বলিলেন,” ইহা পান্থশালা নাএটা আমার বাস ভবন।” আগন্তক প্রশ্ন করলেন,” তোমার পূর্বে এই বাসস্থানে কে ছিল?” ইব্রাহিম বল্লেন ” আমার পিতা আগন্তক পুনরায় প্রশ্ন করলেন,”তার পূর্বে”? ইব্রাহিম বল্লেন ” আমার পিতামহ। আগন্তক পুনরায় প্রশ্ন করলেন,”তার পূর্বে”? ইব্রাহিম অমুক” “অমুক” বলিয়া কয়েকজনের নাম বল্লেন। তখন আগন্তক বল্লেনএখানে যখন একজন আসছেআর একজন চলে যাচ্ছেতখন এটা পান্থশালা নয় তো কি?” এই বলেই আগন্তক দ্রুত পদে বাহিরের দিকে অগ্র্রসর হলেন। ইব্রাহিমও তাঁর পিছে পিছে একাকী ছুটলেন। বহু অনুসন্ধানের পর তাঁকে তিনি পেলেন। ভয় জড়িত কন্ঠে তিনি তাঁকে জিজ্ঞাসা করলেন, “আপনি কে?” গুরু গম্ভীর স্বরে উত্তর আসল, “আমি খিজির। উত্তর শনে তাঁর মনে অশান্তির সৃষ্টি হলো। তিনি ফিরে এসে মনে অশান্তি দূর করার জন্য শিকারে যেতে মনস্থির করলেন।একদিন কিছু সংখ্যাক সহচর সঙ্গে নিয়ে তিনি শিকারে বের হলেন। ইতস্তঃত ঘুরতে ঘুরতে তিনি আপন সহচর হতে বহু দূরে সরে পড়েন। এমন সময় তিনি গায়েবী আওয়াজ শুনতে পান,” এখনো জাগ্রত হও” এমন আওয়াজ তিনি ৩ বার শুনতে পান। ৪র্থ বার শুনতে পেলেন, ” মৃত্যু তোমাকে জাগাবার পূর্বে তুমি জাগ্রত হও। ইহা শুনা মাত্রই ইব্রাহিম বেহুঁশ হয়ে পড়ে যান। কিছুক্ষন পর হুঁশ ফিরলে তিনি কিছুদূর অগ্রসর হলে একটি হরিণ দেখতে পান। তিনি তা শিকারে উদ্যত হলে হরিণ বলে উঠল,” হে ইব্রাহিম! তুমি আমাকে শিকার করতে পারবে নাবরং আমি তোমাকে শিকার করতে প্রেরিত হয়েছি। হে ইব্রাহিম! এই কাজের জন্যই কি তোমার সৃষ্টি?” ইব্রাহিম অবাক হয়ে ঘোড়ার পিঠে আরোহন করলেন। ঘোড়ার জীন হতেও একই আওয়াজ আসতে লাগল। এতে তিনি স্তম্ভিত হয়ে পড়েন এবং অঝোর ধারায় কাঁদতে থাকেন। তিনি খাঁটি মনে আল্লাহর দরবারে তওবা করলেন। দুনিয়ার মায়াজাল ও মোহো মন থেকে ছিন্ন হয়ে গেলো। লোকালয়ে আর ফিরে যাবেন না মনস্থ করে গভীর জঙ্গলের দিকে অগ্রসর হলেন। শাহী লেবাছ রাখালকে দিয়ে চটের লেবাছ পরিধান করলেন। বাদশাহ ইব্রাহিম বাদশাহীর পরিবর্তে ফকিরী জীবন গ্রহণ করে পদব্রজে বনে জঙ্গলে ঘুরতে লাগলেন এবং আল্লাহর দরবারে কাঁদতে লাগলেন। খোদাপ্রেমে নিজেকে বিলিয়ে দিয়েশাহী জীবন ত্যাগ করে তিনি পথ অতিক্রম করতে লাগলেন।
কিছুদিন পর তিনি মার্ভ নামক স্থানে উপস্থিত হয়ে এক অন্ধ ব্যাক্তিকে পুলের উপর দিয়ে গমন করতে দেখেন। পুল হতে তার পড়ে যাওয়ার । আশঙ্কা থাকায় ইব্রাহিম বল্লেন,”আল্লাহ তাকে রক্ষা করো। তখনই সেই অন্ধ ব্যাক্তি শুন্যে বেড়াতে লাগল। এই দেখে ইব্রাহিম ভাবলেনইনি জানি কত বড় দরবেশ! সেখান থেকে তিনি ঘুরতে ঘুরতে নিশাপুরের নিকটস্থ এক গুহায় আশ্রয় নেন। নয় বৎসর তিনি সেখানে আল্লাহতায়ালার এবাদতে মশগুল ছিলেন। সেখানে তিনি অসাধারণ সাধনা এবং নফসের বিরুদ্ধে জিহাদ করেন। এমন নির্জন গুহায় একাকী বাস করা সাধারণ মানুষের পক্ষে ছিল অসম্ভব। প্রত্যেক বৃহস্পতিবার তিনি গুহা হতে বের হতেন এবং জঙ্গল হতে জ্বালানী কাঠ সংগ্রহ করে বোঝা বেঁধে রাখতেন। পর দিন প্রাতে তা নিশাপুর নিয়ে বিক্রি করতেন। সেখানে জুমআর নামাজ আদায় করে কাষ্ঠ্য বক্রির মূল্য দিয়ে কিছু রুটি ক্রয় করতেন। রুটির অর্ধাংশ কোন দরিদ্রকে দান করে দিতেন। গুহায় ফিরে বাকি অর্ধেক রুটি আহার করে পরবর্তি বৃহস্পতি বার পর্যন্ত স্বীয় প্রভুর এবাদতে মশগুল থাকতেন।
 
হযরত ইব্রাহিম মোনাজাত করতেন,” হে মালিক! তুমি আমার প্রতি যে রহমত করেছআটটি বেহেশতও তার তুলনায় কিছু নয়। তোমার যিকির এর সাথে আমাকে যে প্রেমসুধা প্রদান করেছেআটটি বেহেশতের সুখও তার তুলনায় কিছু নয়। এলাহী! আমাকে গোনাহের অপমান হতে মুক্তি দিয়ে তোমার হুকুম পালনের মর্যাদা দ্বারা সম্মানিত কর।কথিত আছেইব্রাহিম আদহাম ৪০ বছর ধরে ক্রন্দন করতে করতে পথ অতিক্রম করে মক্কা শরীফ পৌছান। তাঁর আগমনের কথা শুনে মক্কার দরবেশগণ তাঁকে অভ্যার্থণা করে এগিয়ে আনার জন্য অগ্রসর হন।কেউ যেন তাঁকে চিনতে না পারে সেই কারণে ইব্রাহিম তাঁর কাফেলা পৌছানোর পূর্বেই মক্কা শরীফ পৌছান। দরবেশগনের জনৈক খাদেম ইব্রাহিমকে অভ্যার্থনা জানানোর জন্য সকলের আগে কাফেলার দিকে রওনা হয়েছিল পথে তাঁর সাথে সাক্ষাৎ হলে (যেহেতু সে ইব্রাহিমকে চেনে না) খাদেম জিজ্ঞাসা করল,” ইব্রাহিম আদহাম কি নিকটেই আছেনমক্কা শরীফের বুযুর্গগন তাঁকে অভ্যার্থণার জন্য আসছেন…” ইব্রাহিম উত্তরে বলেন,” সেই জিন্দিক( অবাধ্য) এর নিকট তোমার কি প্রয়োজনউত্তর শুনে খাদেম ক্রোধান্ধ হয়ে তাঁকে চপেটাঘাত করে বল্লো,” বেটা! তুই এমন দরবেশ ব্যক্তিকে জিন্দিক বল্লি! তু-ই জিন্দিক!” ইব্রাহিম বল্লেনবাপু হে! আমিও তো তাই বলছি-আমি জিন্দিকই বটে!” অতঃপর একটু সরে গিয়ে ইব্রাহিম নিজের মনকে বল্লেন, ” হে মন! তুমি চেয়েছিলে যে মক্কা শরীফের দরবেশগণ তোমাকে অভ্যার্থণা করবেনএখন এর উপযুক্ত শাস্তি পেয়েছ তো! আল্লাহপাককে ধন্যবাদ! তুমি যেমন ধারণা করেছতেমনই ফল পেয়েছ।

 পরে অবশ্য উক্ত খাদেম নিজের ভুল বুঝতে পেরে ক্ষমা চেয়ে নিয়েছিল।এর পর তিনি মক্কা শরীফে বসবাস শুরু করেন। ।নেক লোক তাঁর মুরিদ হন। তিনি সময় সময়ে নিজে পরিশ্রম করে জঙ্গল থেকে জ্বালানী কাঠ কেটে এনে বাজারে বিক্রয় করে খাদ্য সংগ্রহ করতেন। কখনো বা রাখালের কাজ করে আবার কখনো শাক সব্জি বিক্রয় করে কা দ্বারা জীবিকা নির্বাহ করতেন।
 
বলখ ত্যাগের পূর্বে তিনি এক দুগ্ধ পোষ্য শিশু রেখে এসেছিলেন। পুত্র বয়প্রাপ্ত হলে তাঁর মা`কে তার পিতার কথা জিঞ্জাসা করলে কার মা সকল ইতিহাস পুত্রকে জানিয়ে বলেন এখন তিনি মক্কা শরীফে অবস্খান করছেন।তখন পুত্র পিতার সাথে সাক্ষাতের জন্য সিদ্ধান্ত নেয়। বলখের চার হাজার হজ্জ গমনেচ্ছুদের সাথে পথ খরচ দিয়ে পুত্র মাকে নিয়ে মক্কা শরীফ আসেন। পুত্র মক্কার হেরেম শরীফে ফকিরি লেবাস পরা দরবেশগণকে দেখে ইব্রাহিম আদহাম এর খোজ করলে তাঁরা বলেন,” তিনিই আমাদের শায়খ (ধর্মগুরু)তিনি জঙ্গলে কাঠ কাটতে গেছেনতিনি তা বিক্রয় করে তাঁর এবং আমাদের রুটি ক্রয় করবেন। এ কথা শুনে পুত্র জঙ্গলের দিকে গমন করে দেখতে পেলো এক বৃদ্ধ লোক কাঠের বোঝা ঘাড়ে করে আসছেন। পুত্র তাঁকে পিতা অনুমান করে কাঁদতে কাঁদতে তাঁর পিছে পিছে ছুটলেন। ইব্রাহিম বাজারে গিয়ে বল্লেন,” প্রবিত্র বস্তুর পরিবর্তে পবিত্র বস্তু ক্রয় করতে কে চায়?” এক ব্যাক্তি তখন তাঁকে কিছু রুটি দিয়ে পরিবর্তে তাঁর কাঠ গুলো কিনে নিলো।ইব্রাহিম রুটি গুলি নিয়ে মুরিদের কাছে গেলেন এবং নামাজ আদায় করে তা আহার করলেন।

অতপর তিনি ও তাঁর মুরিদগন কাবা শরীফের তাওয়াফ কার্যে রত হন। ঘটনা ক্রমে তাঁ পুত্রও তাওয়াফ কার্যে রত ছিলেন। পুত্র তাঁর সম্মুখীন হলে ইব্রাহিম কিছুক্ষন তাঁর দিকে চেয়ে থাকেন।এবং তাঁর মনে হয় এই সেই বালক যাঁকে তিনি বলখে দুগ্ধপোষ্যাবস্থায় রেখে এসেছিলেন!তিনি বিষয়টি মুরিদগনকে অবহিত করেন।
পরদিন জনৈক মুরিদ বলখের কাফেলায় হমন করে রেশম নির্মিত এক তাঁবুতে ঐ বালককে দেখতে পান। যুবক সেখানে বসে কোরআন পাঠ করছিলেন। আর তাঁর গাল বেযে অশ্রু ঝরছিল। তিনি যুবকের সামনে গিয়ে তাঁর পরিচয় জানতে চাইলে যুবকটি আরো কাঁদতে থাকে এবং বলেন,” আমার বাড়ি বলখ নগরে এবং আমার পিতার নাম ইব্রাহিম আদহাম! আমি পিতাকে দেখি নাই। কারণ তিনি শৈশবেই আমাদেরকে ছেড়ে চলে এসেছেন। গতকাল একজন বৃদ্ধকে দেখে তাঁকে আমার পিতা বলে মনে হয়েছে কিন্তু পরিচয় জিজ্ঞাসা করি নাইকারণ তিনি আমাদেকে আগেই ছেড়ে চলে এসেছেনএখন পরিচয় পেলে যদি আবার আত্মগোপন করেন!” একথা শুনে উক্ত দরবেশ মুরিদ বল্লেন,” আপনি আমার সাথে এখনই চলুনআমি আপনার সাথে তাঁর পরিচয় করিয়ে দেব। ইব্রাহিম তখন ইয়ামনী নামক স্থানে মরিদগন সাথে বসে ছিলেন। দুর হতেই তিনি নিজ পুত্র এবয় স্ত্রীকে তাঁর ঐ মুরিদের সাথে আসতে দেখেন। মুরিদ শাহজাদা এবং তাঁর মাতাকে ইব্রাহিমের সাথে মিলিয়ে দিলে তাঁহারা অস্থির হয়ে রোদন শুরু করেন। তাঁদের ক্রন্দনে মুরিদগনেরও ক্রন্দন বের হলো। কাঁদতে কাঁদতে পুত্র বেহুঁশ হয়ে পড়ে গেলেন। হুঁশ ফিরলে তিনি পিতাকে তাযিমের সাথে সালাম করলেন। পিতা সালামের জবাব দিয়ে পুত্রকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেল্লেন। তারপর পুত্রকে জিজ্ঞাসা করলেনবাবা! তুমি কোন ধর্মে আছপুত্র বল্লো, “ইসলাম ধর্মে!” পিতা বল্লেনআলহামদুলিল্লাহ!আচ্ছা তুমি কোরআন শরীফ পড়েছ কি?” পুত্র জবাবে বল্লেন “জ্বী। ইব্রাহিম আলহামদুলিল্লাহ বলে উঠে দাড়িয়ে যেতে উদ্যত হলে তাঁর স্ত্রী এবং পূত্র তাঁকে ছাড়তে চাইলো না। তখন তিনি আকাশের দিকে মুখ করে বল্লেন ইলাহী! আগেছনি!” অর্খাৎ হে আল্লাহ! আমাকে সাহায্য করো!” তাঁর পুত্র তখন তখনই তাঁর সামনে ইন্তেকাল করে গেলেন। মুরিদগন অবাক হয়ে প্রশ্ন করলেন, “হযরত! একি হলো?” ইব্রাহিম বল্লেন” যখন পুত্রকে আলিঙ্গন করলামতখন আমার অন্তরে তার প্রতি ভালোবাসার উদ্রেক হলো। এবং তৎক্ষনাৎ আওয়াজ এলো,” হে ইব্রাহিম! তুমি আমার বন্ধুত্বের দাবী করোআর এখন দেখছি আমার ভালোবাসার সাথে অন্যকে তুমি হৃদয়ে স্থান দিয়েছ! তুমিই মুরিদগনকে উপদেশ দিয়ে থাক যে তোমরা সন্তান ও স্ত্রীর প্রেমে পোড়ো নাআর এখন তুমিই পুত্র ও স্ত্রীর প্রেমে মত্ত!এই গায়েবী আওয়াজ শুনে আমি আরয করলাম হে আল্লাহ! যদি পুত্রের ভালোবাসা তোমার ভালোবাসা হতে আমাকে বঞ্ছিত করেতবে হয় আমার প্রাণনা হয় পুত্রের প্রাণ গ্রহণ করো। আমার পূত্রের অনুকুলেই এই দোয়া কবুল হয়েছে! ইব্রাহিম বলেন, “রাত্রে কাবা গৃহে একাকী মোনাজাত করবার সুযোগ আমি বহুদিন থেকে খুজছিলামকিন্তু সুযোগ পাচ্ছিলাম না। 

ঘটনাচক্রে এক রাত্রে খুব বৃষ্টি হওয়ায় আমাকে ছাড়া সেই সময় তাওয়াফকারী আর কেউ ছিলো না। সে সুযোগে আমি পবিত্র গৃহে হাত রেখে নিজ গোনাহর জন্য তওবা করলাম। গায়েব হতে আওয়াজ আসলো, ” হে ইব্রাহিম! তোমার মত সমস্ত মাখলুক আমার নিকট এ-ই চায়। যদি আমি সকলকে এখানেই ক্ষমা করিতবে আখেরাতে আমার অনন্ত ক্ষমা ও দয়া কোথায় দেখানো হবে!তিনি বলেছেন,”আমি ১৫ বৎসর কঠোর সাধনার পর এই বানী শুনলামঃ তুমি আরামে আছতাঁর বান্দা(দাস) হও এবং হুকুম পালনে দৃঢ় সংকল্প হও।একবার লোকে তাঁকে জিজ্ঞাসা করলো,” আচ্ছাআপনি বাদশাহী ছাড়রেন কেন?” তিনি বল্লেন,” একদিন আমি শাহী তখতে বসে আছি,আমার সম্মুখে তখন এক আয়না ছিল। তার প্রতি নজর করে আমি দেখতে পাইআমার স্খান কবরেকিন্তু সেই দীর্ঘ পথের সাথী হিসাবে কোন বন্ধুই আমার সঙ্গে নাই। নিজের পথের সম্বল কিছুই সঙ্গে দেখতে পেরাম না। অথচ হাকিম ও মুন্সেফগনকে উপস্থিত দেখা গেল। কিন্তু আমার নিকট দলিল পত্র বলতে কিছুই নাই। এই দেখে আমার মন হতে বাদশাহীর মোহ দূর হয়ে গেলো।লোকে জিজ্ঞাসা করল,” আপনি খোরাসান হতে এখানে কেন আসলেন?” তিনি বলেন,” সেখানে লোকে আমাকে বার বার জিজ্ঞাসা করতগতকল্য আপনি কিরুপ ছিলেনঅদ্যই বা কিরুপ আছেন?” লোকে জিজ্ঞাসা করল,” আপনি স্ত্রী গহণ করেন না কেন?” তিনি বলেন,” কোন স্ত্রী লোক কি এই উদ্দ্যেশ্যে স্বামী গ্রহণ করে যেসে অন্ন বস্ত্র হীন ও খালি পায়ে থাকবেপারলে আমি নিজেকেই তালাক দেই অবস্থায় অন্য একজন স্ত্রীলোককে কিরুপে প্রতারণা ও ফাঁকির বন্ধনে বেঁধে রাখতে পারি!একদা ইব্রাহিম কোন এক এক দরবেশকে দেখতে পেলো যেতিনি অপর এক দরবেশের গীবত (কুৎসা রটনা) করছেন। তিনি সেই দরবেশকে তিরস্কার করে বল্লেন, “মনে হয় তুমি বিনামূল্যে দরবেশী ক্রয় করেছ?” ইব্রাহিম বলেনআমাকে দেখ,” আমি বলখ রাজ্যের বিনিময়ে দরবেশী ক্রয় করেছিতবু এই সওদায় আমি লাভবার হয়েছিকেননা রাজ্যের তুলনায় দরবেশী অনেক বেশী মূল্যবান বস্তু।কেন এক লোক এক হাজার দিরহাম এনে ইব্রাহিমকে বল্লেন, ” আপনি এটি গ্রহণ করুন তিনি বল্লেন,” আমি দরিদ্র হতে কিছুই গ্রহণ করি না। সেই লোক বল্লেন,” আমি দরিদ্র নই ধনী!” ইব্রাহিম জিজ্ঞাসা করলেন,” তোমার সম্পত্তি আছেতুমি কি তার চেয়েও আরো বেশী চাও?” সে বল্লো, “হ্যা!। তখন ইব্রাহিম বল্লেন,” তবে তুমি তো একজন বড় ভিক্ষুকতোমার মুদ্রা ফেরৎ লইয়া যাও।” আক্ষেপ করে তিনি এও বলেন, “হায়! আমি অন্বেষন করি দরিদ্রতাআর উপস্থিত হয় ধন দৌলত।কোন গায়েবী শুভ ঘটনা ঘটিলে তিনি আনন্দে চীৎকার করে বলতেন,” দুনিয়ার রাজা-বাদশাহরা কোথায়তাঁরা এসে দেখুকসর্ব শক্তিমানের একি রহস্যময় কাজ! এটি দেখলে তো তাঁরা রাজ্যের মোহ আর গর্বের জন্য লজ্জিত হতো
তিনি বলতেন,”যে কাম-রিপুর বশবর্তীসে সত্য নয়। সরলতা ও সরল মন দ্বারা খোদাকে পাওয়া যায়। তিন অবস্থায় যার মন খোদার দিকে হাযির না থাকেতার জন্য সত্যের দরজা বন্ধঃ ১। কোরআন শরীফ তেলাওয়াৎ কালে২। নামাজ পড়বার কালে৩। যিকির অর্থাৎ সাধনার সময়।আরেফ বা খোদাতত্ববিদ লোকের চিহ্ন এই যেতিনি অধিকাংশ সময়ই খোদা সম্মন্ধে ধ্যান করেন এবং প্রত্যেক বস্তু হতে উপদেশ গ্রহণ করেন। তিনি সাধারণ ভাবে খোদার প্রশংসা ও গুনকীর্তন করেন। খোদাতাআলার এবাদতই তাঁর সর্ব প্রধান কাজ। তিনি সর্বদা আল্লাহ তায়ালার শক্তি এবং সৃষ্টি সমুহের প্রতি চিন্তা ও গবেষণা করেন।
ইব্রাহিম বলেনএকদা পথে এক খন্ড বড় পাথর দেখতে পেলাম। উহার উপরে লেখা ছিল, ” এটি উল্টিয়ে পড়ো।” পাথর খন্ডটি উল্টিয়ে দেখলাম,” তাতে লেখা আছেযা তুমি জানতা করার শক্তি থাকা সত্বেও কেন সেই মত কার্য্য কর নাআবার যা জানো নাতা অন্বেষণে কেন রত হও না?”সাধকের মন হতে তিনটি পর্দা উঠে গেলেই সত্যের (খোদার নৈকট্য) দরজা খুলে যায়-১। দুনিয়া ও আখেরাতের বাদশাহী পেয়েও সন্তুষ্ট না হওয়াঅর্থাৎ আল্লাহর এবাদতে মশগুল থাকা২। উহা কেড়ে নিলেও চিন্তিত বা দুঃখিত না হওয়াকেননা আল্লাহর সন্তুষ্টির বিরুদ্ধাচরণ করা তাঁর ক্রোধ ও গযবে পতিত হওয়ার লক্ষণ। তাঁ-র গযবে যে-ই পড়েছেসেই শাস্তির উপযুক্ত৩।প্রশংসা ও দানের প্রতি আসক্ত না হওয়াকারণ যে ব্যাক্তি দানের লোভে পতিত হয়সে কাপুরুষ এবং কাপুরুষ সর্বত্রই লাঞ্ছিত হয়। অতএব আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য বুকে সৎ সাহস থাকা প্রয়োজন।বর্ণিত আছেইব্রাহিম এক ব্যাক্তিকে জিজ্ঞাসা করলেন,” তুমি কি খোদা প্রেমিক হতে চাও?” সে বল্লো হ্যা চাই বই কি!” তিনি বলেন,” তাহলে শরিয়ত বিরোধী সকল সম্মন্ধ ত্যাগ করো। আল্লাহ ব্যতিত সমস্ত বস্তু হতে নিজের অন্তরকে মুক্ত করো এবং আল্লাহতায়ালার জন্য নিজেকে ফানা (বিলীন) করে দাও। হালাল (বৈধ) খাদ্য খাও। রাত্রিতে তাহাজ্জোদের নামাজ পড়া ও দিনে রোজা রাখার চেয়ে হালাল খাদ্যের দ্বারা তোমার বাসনা সহজে পুরণ হতে পারে। তিনি আরো বলেন, ” হালাল খাদ্য ব্যতীত শুধু নামাজরোযাহজ্জ ও জিহাদ দ্বারা কেউই সাধক হতে পারে না
লোকে বল্লো, ” অমুক গ্রামে জনৈক যুবক দরবেশ অবস্থান করছেন এবং সর্বদা এবাদতে মশগুল থাকেন। ইব্রাহিম বলেন,” আচ।চা আমাকে সেখানে নিয়ে চল।আমি তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করব।” যথাসময়ে ইব্রাহিম তাঁর নিকট গমন করলেন। যুবক ইব্রাহিমকে বল্লেন,” আপনি ৩ দিন পর্যন্ত আমার মেহমান রুপে থাকবেন।” ইব্রাহিম রাজী হলেন এবং ৩ দিন পর্যন্ত তাঁর অবস্থাদি সূক্ষ্ণভাবে দর্শন করলেন। লোক মুখে যা শুনেছিলেনযুবককে তা অপেক্ষা অধিকতর এবাদতে মশগুল থাকতে দেখতে পান। এতে তিনি মনে মনে নিজেকে বড়ই ধিক্কার দিলনে যেএই যুবক তাঁর চেয়েও রাত্রী জাগরণে ও এবাদতে উন্নতআর তিনি তাঁর চেয়ে বহুগুনে নিকৃষ্ট। তিনি ভাবলেন,” তাঁর মধ্যে শয়তানের কোন দখল আছে কিনা আমি পরীক্ষা করে দেখব। মনে মনে বল্লেন,” আমি তাঁর আসল কাজ অনুসন্ধান করবযা দ্বারা তিনি তাঁর রুযী রোজগার করেন।” অনুসন্ধান করে তিনি দেখেন যেতারঁর উপার্জিত খাদ্য হালাল নয়। ৩ দিন পর ইব্রাহিম যুবককে বল্লেনতোমাকে তিনদিনের জন্য আমার মেহমান হয়ে থাকতে হবে।” যুবক রাজী হলে তাঁকে সঙ্গে নিয়ে ইব্রাহিম তাঁর বাড়িতে আসলেন এবং নিজের হালাল রুযীর খাদ্য তাঁকে খাওয়ালেন। এতে যুবকের এবাদতের অবস্থা এবং খোদার প্রতি প্রেম ও আসক্তি ক্রমশঃ কমে যেতে লাগল। যুবক অবাক হয়ে বল্লেন,” আপনি আমাকে কি করলেন?” ইব্রাহিম বলেন,”আমি কিছুই করি নাইতবে পূর্বে তোমার খাদ্য বস্তু হালাল ছিল না। শয়তান তোমার সেই খাদ্যের সাথে তোমার ভিতরে প্রবেশ করতআবার বাইরে আসত। এক্ষনে হালাল খাদ্য তোমার মধ্যে প্রবেশ করেছেসেই খাদ্যই এটি করেছেএবং আসল রহস্য প্রকাশ করে দিচ্ছে। মনে রেখো এবাদত হালাল রুযী ও হালাল খাদ্যের উপরে নির্ভর করে।একদা হযরত সুফিয়ান কে ইব্রাহিম বলেন, “যদিও তোমার জ্ঞ্যান অনেক বেশীকিন্তু তুমি একটু দৃঢ় বিশ্বাসের মুখোমুখি। বর্ণীত আছে তিনি পবিত্র রমজান মাসে মাঠ হতে ঘাস কেটে এনে বিক্রয় করেতেন। এতে যা উপার্যন হতোতা দরবেশদের মধ্যে বন্টন করে দিয়ে সারারাত নামাজে মশগুল থাকতেন। লোকে তাঁকে জিজ্ঞাসা করলো,” আচ্ছা আপনার নিদ্রা হয় না কেন?” তিনি বলেনখোদা প্রেমে আমার এক মুহুর্তও শান্তি নাই। শান্তির অভাব হলে কিরুপে নিদ্রা আসবে?” তিনি নামাজ পড়ে হাত মুখের উপরে রেখে বলতেন,” (খোদা না করুন) এই নামাজ আমার মুখে নিক্ষিপ্ত হবে বলে আশঙ্কা করছি
একদিন তাঁর কোন প্রকার খাদ্য জুটল না। এর শোকর স্বরুপ রাত্রিতে তিনি চারি রাকাত নামাজ পড়লেন। দ্বিতীয় রাতেও খাদ্য জুটলো না। সেই রাতেও তিনি চার রাকাত নামাজ পড়লেন।এই রুপে সাত রাত কেটে গেলো। অনাহারে তিনি দূর্বল হয়ে পড়লেন। সেই অবস্থায় আরয করলেনঃ হে খোদা! এখন যদি কিছু খেতে দাও,তবে ভালো হয়!” তখনই সেখানে এক যুবক এসে জিজ্ঞাসা করল,” আপনার কি খাদ্যের কি আবশ্যক আছে?” তিনি বলেন,”হ্যা। যুবক বলেন,”তবে আপনি আমার মেহমান হয়ে আমার সাথে আমার বাড়িতে চলুন।” যুবক তাঁকে নিয়ে বাড়িতে পৌছিলেন। সেখানে তাঁর চেহারার প্রতি নজর করতেই যুবক হঠাৎ চিৎকার করে বলে উঠলোহুজুর! আমি তো আপনারই সেই পুরাতন গোলাম। আমার যা কিছু দেখছেন সবই তো আপনার! ইব্রাহিম বল্লেন,”আমি তো তোমাকে আজাদ করে দিয়েছি।তোমার নিকট যে সমস্ত ধন আছে তা তোমাকে দান করলাম। এখন আমাকে যাবার অনুমতি দাও। এতে যুবক হতভম্ব হয়ে গেলো। ইব্রাহিম বলেন,” হে খোদা! আজ থেকে কসম করছি যে আর কখনো কোন ব্যাক্তির নিকট কিছু চাইব না। আমি তোমার নিকট শুধু এক খন্ড রুটি চেয়েছিআর তুমি আমাকে দুনিয়ার ধন এনে দিচ্ছ!
কোন এক রাত্রে ইব্রাহিমের একজন মুরিদ একখানি অনিবাদ মসজিদে পীড়িত অবস্থায় ছিলেনতখন অত্যান্ত শীত ছিল এবং মসজিদের দরজায় কপাট ছিল না। ভোর বেলা পর্যন্ত ইব্রাহিম দরজায় দাঁড়িয়ে ছিলেন। রোগী পরে জিজ্ঞেস করলেন,” আপনি কেন সারারাত্রী দাড়িয়ে কাটিয়ে দিলেন”? তিনি উত্তরে বলেন,” রাত্রে অত্যান্ত ঠান্ডা বাতাস হচ্ছিলযাতে তোমার ঠান্ডা কম লাগেসেজন্য আমি দাড়িয়ে ছিলাম।সাহল ইবনে ইব্রাহিম বলেন,” একসময় আমি ইব্রাহিমের সাথে বিদেশে যাত্রা করি। পথে হঠাৎ আমি পীড়িত হেয়ে পড়ি। নিজের যা কিছু ছিলইব্রাহিম তার সমস্ত কিছু আমার ঔষধ ও পথ্যে ব্যায় করলেন। আমার চিকিৎসার জন্য তবুও অর্থের অভাব হওয়ায় তিনি নিজের গাধাটিও বিক্রয় করে দিলেন। একটু সুস্থ্য হয়ে আমি জিজ্ঞাসা করলাম ,”হযরত! গাধাটি কোথায়?” তিনি বল্লেন, “বিক্রয় করেছি। আমি বল্লাম “কিসে চড়ে যাব”? তিনি বল্লেন ” আমার কাঁধে চড়। তিন দিনের পথ তিনি আমাকে কাঁধে বহন করে নিয়ে যান

হযরত ইব্রাহিম বলেন,” আমি ৪০ বৎসর মক্কাশরীফের কোন ফলই ভক্ষন করি নাই। কারণ, (হারাম মাল দ্বারা) সৈণ্যগন মক্কা শলীফের কোন কোন ফলের জমি ক্রয় করেছিল। তিনি পায়ে হেঁটে বহুবার হজ্জ করেন এবং ৫০ বৎসর কা`বা শরীফের নিকট অবস্থান করেন। এই দীর্ঘকালের মধ্যে কথনো জমজম কূপ হতে নিজ হাতে পানি তুলেন নাইকারণ পানি ইঠাবার বালতি সেই সময়কার বাদশাহ দিয়াছিলেন!

ইব্রাহিম দিন মজুরি করে জীবন যাপন করতেন। সারাদিন কাজ করে সন্ধ্যার পর বাগিতে আসতেন এবং ফিরবার সময় মুরিদগণের জন্য নিজ রোজগারের অর্থ দ্বারা খাদ্য দ্রব্য কিনে আনতেন।একদিন কাঁর ফিরতে বিলম্ব হয়। তাঁর মুরিদগন তাঁর জন্য কিছু সময় অপেক্ষা করে নিজেদের উপার্জিত অর্থ দ্বারা রাত্রের আহার কিনে খেয়ে শুয়ে পড়ে। ইব্রাহিম এসে দেখেন সকলেই ঘুমিয়ে গেছেন। এটি দেখে তিনি খুব দুঃখিত এবং মর্মাহত হলেন। তিনি ভাবলেন,”আহা! বেচারগন হয়ত না খেয়েই শুয়ে পড়েছে। সারারাত তাঁরা ক্ষুধার জ্বালায় কষ্ট করবে। এই ভেবে তিনি যে আটা এনেছিলেন তা দিয়ে রুটি বানিয়ে তা সেকার জন্য বার বার চুলা ফুঁকতে লাগলেন। কিন্তু কিছুতেই আগুন জ্বলছিল না। এমন সময় তাঁর একজন মুরিদ ঘুম থেকে জেগে অন্যান্য মুরিদগণকে জাগাল।তাঁরা ইব্রাহিমকে জিজ্ঞাসা করলো,”আপনি কি করেন?” তিনি বলেন,” আমি এসে দেখি তোমরা ঘুমিয়ে গেছ। ভাবলামতোমরা হয়তো না খেয়েই ঘুমিয়ে পড়েছো। এইজন্য তোমাদের জন্য খাবার বানিয়ে রাখছিযেন তোমরা ঘুম থেকে উঠেই খেতে পারো।” তাঁা পরস্পর অবাক হয়ে বলাবলি করতে লাগলদেখো আমরা তাঁকে নিয়ে কি ভাবিআর তিনি আমাদের জণ্য কি ভাবেন!
যদি কোন ব্যাক্তি তাঁর কাছে মুরিদ হয়ে তাঁর নিকট সঙ্গী হয়ে থাকতে চাইততবে তিনি তিনটি শর্তে তাকে মুরিদ করতে রাজী হতেন,১। সকলের খেদমত তিনিই (ইব্রাহিম নিজে) করবেন,২। নামাজের আজার শুধু তিনিই দেবেন৩। কোন খাদ্য দ্রব্য পাওয়া গেলে সমান ভাবে বন্টন করে নেবেন।

এক ব্যক্তি বহুদিন তাঁর সহচর রুপে ছিল। অবশেসে একদিন ইব্রাহিমের নিকট হতে বিদায় চেয়ে সে বল্লো,” হযরতএই দীর্ঘকাল আমার মধ্যে যে ত্রুটি দেথেছেনতা আমাকে খুরে বলুন। তিনি বল্লেন,” আমি তোমাকে সর্বদা বন্ধু রুপে দেখেছি। কাজেই তোমার ত্রুটি আমার নজরে পড়ে নাই।তুমি অণ্যের নিকট জিজ্ঞাসা করতে পার।
একদা বহু পরিজন বিশিষ্ট এক ব্যক্তি সন্ধ্যায় মলিন মুখে ঘরের দিকে যাচ্ছিলেন। সারাদিন কাজ করেও সে কিছুই রোজগার করতে পারে নাই। বাড়ি ফিরে ছেলে-মেয়েকে কি দিবেএটাই ছিল তার দুঃখের কারণ। পথের ধারে সে ইব্রাহিমকে দেখে বল্ল,” আমি পারিবারিক যন্ত্রণায় অস্থিরআর আপনি নিশ্চন্ত মনে বসে আছেন দেখে আমার বড়ই ইর্ষা হয়। ইব্রাহিম বল্লেনভাই! আমি সারা জীবন যে সকল সোয়াবের কাজ করেছিতা তোমাকে দিয়ে দিলামআর তুমি আজকের এই এক ঘন্টার চিন্তাগুলি আমাকে উহার বদলে দিয়ে দাও
একদিন খলিফা মো`তাসিম বিল্লাহ হযরত ইব্রাহিমকে জিজ্ঞেস করলেন,” আপনি কি কাজ করেন?” তিনি বল্লেন,” যারা দুনিয়ার ভোগ বিলাস চায়তাদের জন্য আমি দুনিয়া ত্যাগ করেছিযারা আখেরাত চায়তাদের জন্য আখেরাত দান করেছি। আর নিজের জন্য এই দুনিয়ায় খোদাতায়ালার জিকিরকে ও আখারাতে খোদাকায়ালার দর্শন লাভকেই পছন্দ করেছি

একদা নাপিত তাঁর গোফ কাটছিলো। ঠিক এমন সময় জনৈক মুরিদ সেই স্থান দিয়ে যাচ্ছিলেন। তিনি বল্লেন,” আপনার নিকট কিছু থাকলে এই নাপিতটাকে দেবেন। তখনই তিনি মুদ্রা ভরা ভরা একটি থলে নাপিতকে দান করলেন। এমন সময় এক ভিক্ষুক উপস্থিত হয়ে নাপিতের কাছে ভিক্ষা চাইলো। নাপিত তখনই মুদ্রাপূর্ণ থলেটি ভিক্ষুককে দান করল। ইব্রাহিম নাপিতকে বললেন, “ওহে! ওটাতো সোনার মুদ্রায় ভরা ছিল!” নাপিত বল্লোতা আমি জানি! যে ধন দৌলতে ধনীসে প্রকৃত ধনী নয়যে অন্তরে ধণীসেই প্রকৃত ধনী! নাপিত আরো বলেন,” হে মুর্খ! আমি যাকে দান করেছিসে-ও জানে যে ওতে কি আছে!” এই শোনে ইব্রাহিম অত্যান্ত লজ্জিত হলেন এবং নিজের নফসে আম্মারার ( রিপু) প্রতি নযর রেখে বল্রেন ,” বেশ যেমন কর্ম তেমন ফল পেয়েছ

একদা ইব্রাহিমকে লোকে জিজ্ঞাসা করল,” আপনি বাদশাহী ছেড়ে ফকিরিতে পা দিবার পর হতে আজ পর্যন্ত কথনো কি আনন্দ ভোগ করেছেন?” তিনি বলেন,” আমি কয়েকবার আনন্দিত হয়েছি। একবার নৌকায় চড়েছিলাম। আমার মলিন পোশাক ও যত্নবিহীন বিশ্রী চুল দেখে আরোহীগণ হাস্য করছিল। তন্মধ্যে এক কৌতুকি বার বার এসে আমার মাথার চুল ধরে টানছিল এবং ধাক্কা দিচ্ছিল। আপন নফসের অপমানের মনবাঞ্ছা পুর্ণ হওয়ায় আনন্দিত হয়েছিলাম। ইতিমধ্যে নদীতে ভীষন ঢেউ ওঠে এবং নৌকা ডুবে যাবার উপক্রম হয়। মাঝি তখন বল্লোআরোহীদের মধ্য থেকে অন্তত একজনকে নদীতে ফেলে না দিলে নৌকা ডুবে যাবার অশঙ্কা আছে। আরোহীরা আমার কান ধরে নদীতে ফেলে দিতে উদ্যত হলেই ঢেউ থেমে যায়। তারা যখন আমার কান ধরে টানছিলেনতখন নফসের অবমাননা ও হীনতা দেখে আমি মনে বড়ই আনন্দ ভোগ করেছিলাম
একদা কোন মসজিদে বিশ্রাম গ্রহণের জন্য গিয়েছিলাম। লোকে আমাকে মসজিদে শুবার অনুমতি দিলো না। তখন আমি এতই দূর্বল ছিলাম যে আমি উঠতে পারছিলাম না। লোকজন রাগান্বিত হয়ে আমার পা ধরে টানাটানি করে অবশেষে সিঁড়ি পর্যন্ত এনে আমাকে ধাক্কা মেরে ফেলে দেয়। আমি সিঁড়ি দিয়ে গড়িয়ে পড়ার সময় মাথায় আঘাত পেতে থাকি। এই সময় এক একটি আঘাতের সাথে এক একটি গোপন মারেফাত প্রকাশিত হচ্ছিল এবং আমি আন্তরিক আনন্দ অনুভব করছিলাম। এবার লোকেরা আমাকে ধরে রাখলে এক ব্যাক্তি আমার শরীরে প্রস্রাব ফেলিয়া দেয়। এতেও আমি আনন্দ অনুভব করেছিলাম। আর একবার আমার পুস্তিনের (চামড়ার পোশাক) উকিন আমাকে কাটছিল। আমার বাদশাহীর সময়ে আমি যে রেশমী পোশাক পরেছিলামহঠাঃ সেই কথা মনে হলো এবং খারাপ বাসনা আমাকে নানা লোভ দেখাতে লাগলো। কিন্তু আমি সেই লোভে না পড়ায় মনের যে কষ্ট হচ্ছিলতা দেখে আমি বড়ই সন্তুষ্ট হয়েছিলাম।

একদা ইব্রাহিম খোদার উপরে ভরসা করে ময়দানে বের হন। সেখানে তাঁর ক`দিন খাদ্য জুটলো না। তিনি বলেন, “নিকটে আমার এক বন্ধু বাস করত। মনে করলাম যদি আমি তাঁর নিকটে যাইতবে খোদার উপরে আমার প্রকৃত ভরসা থাকে না। কাজেই আমি এক মসজিদে প্রবেশ করে পড়তে লাগলাম তাওক্কালতু য়ালাল হাইয়্যেল্লাজি লা মু`তু অর্থাৎ আমার চীরজীবন্ত প্রভুর উপরে আমি নির্ভরশীল হলাম। আওয়ায এলো,” আল্লাহতায়ালা দুনিয়ার বুক হতে সত্যিকারের তাওয়াক্কুলকারীকে উঠিয়ে নিয়েছিন। তুমি এক মিথ্যাবাদি নির্ভরশীল।
ইব্রাহিম বলেন,”আমি এক ধার্মিক নির্ভরশীল দরবেশকে জিজ্ঞাসা করেছিলামআপনি কিভাবে ও কোত্থেকে জিবীকা প্রাপ্ত হয়ে থাকেন?” তিনি উত্তরে বলেন,”আমি জানি নাযিনি আমাকে জীবিকা প্রদাস করেনতাঁকে জিজ্ঞাসা কর!
তিনি বলেনএকদা আমি এক দাস ক্রয় করলাম। পরে তাকে জিজ্ঞাসা করলাম, “তোমার নাম কি?” সে বল্লো,” আপনি যে নামে ডাকবেনসেটাই আমার নাম। আমি জিজ্ঞাসা করলাম,”তুমি কি খাবে?” উত্তরে সে বল্লো,” আপনি যা খাওয়াবেন। জিজ্ঞাসা করলাম,”তুমি কি ধরণের বস্ত্র পরবে?” উত্তরে সে বল্লো,” আপনি যা দিবেন। জিজ্ঞাসা করলাম,”তোমার আকাঙ্খা কি?” উত্তরে সে বল্লো,”দাসের আবার কিসের আকাঙ্খা ও অভিলাষ।” ক্রীতদাসের এসব উক্তি শুনে আমি মনে মনে নিজেকে বল্লাম,” হে হতভগ্য! সারা জীবনেও তোমার এতটুকু বন্দেগী (দাসত্ব) শিক্ষা হলো না। এই ভেবে কাঁদতে কাঁদতে আমি বেহুঁশ হয়ে পড়েছিলাম।

ইব্রাহিম কথনো চারিজানু হয়ে বসতেন না। লোকে তার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন,” একদা আমি এই রুপ বসে ছিলামতখন গায়েবী আওয়াজ হলো,” হে আদহামের পুত্র! ক্রিতদাস কি প্রভুর সামনে এত জাঁকজমকের সাথে বসে?” তখনই আমি তওবা করে সোজা হয়ে বসলাম;সেই হতে আমি চারিজানু হয়ে বসি না
লোকে তাঁকে জিজ্ঞাসা করেছিল,” আপনি কার বান্দা?” একথা শুনে তিনি কাঁপতে কাঁপতে মাটিতে পড়ে গড়াতে থাকেন। কিছুক্ষণ পর উঠে শান্ত হয়ে বসলেন এবং এই আয়াত পাঠ করলেন- ইন কুল্লা মান ফিস্সামাওয়াতি ওয়ালআরদি ইল্লা আতির্রাহমানি য়াবদা (অর্খাৎ নিশ্চই যাহারা আকাশে এবং ভুমিতে আছেসকলেই পরম দয়ালু হইতে দাস রুপে আগত) লোকে বল্লো, “এই কথা আপনি শুরুতেই কেন বল্লেন না?” তিনি বলেন,” আমি ভয় করলামযদি বলি তাঁর বান্দা (দাস) তবে তিনি দাসত্বের প্রাপ্য হক চাইবেন। আর দাস নই’ একথা বলতেও আমি সম্পুর্ণ অক্ষম
লোকে জিজ্ঞাসা করলো,” আপনি কিরুপে কাল কাটান?” তিনি বলেন,” আমার চারটি বাহন আছে। যখন কোন নেয়ামত উপস্থিত হয়তখন শোকরিয়ার (কৃতজ্ঞতা) বাহনে আরোহণ করে খোদাতায়ালার সম্মুখে অগ্রসর হই। যখন এবাদত করতে যাইতখন খাঁটি প্রেমের বাহণে আরোহন করে তাঁর সম্মুখীন হই। যখন কোন বিপদ উপস্থিত হয়তখন সবর (সহিষ্ণুতা) এর বাহনে আরোহন করে অগ্রসর হই। যখন কোন পাপা কাজ করিতখন তওবার বাহণে আরোহণ করি ও তাঁহার নিকট ক্ষমা প্রার্থণা করি।

হযরত ইব্রাহিম আদহাম কোন এক লোককে উপদেশ দিতে গিয়ে বলেন,” যে পর্যন্ত তুমি নিজ স্ত্রীকে বিধবা স্ত্রীলোকের ন্যায় মনে না করবেসন্তানদিগকে এতিমের ন্যায় মনে না করবে এবং রাত্রে কবরে শয়নের মত মনে না করে শুবেসে পর্যন্ত তুমি সাধক শ্রেণীভুক্ত হতে পারবে না
একদা ইব্রাহিম সাধকগণের এক মজলিশে উপস্থিত হয়ে তাদের পার্শ্বে বসতে চাইলেন। তাঁরা ইব্রাহিমকে বল্লেন,” আপনি এখানে বসবেন না। কেননা আপনার শরীর হতে এখনো বাদশাহী গন্ধ আসছে। ইব্রাহিম ইতস্ততঃ না করে অন্যত্র যেয়ে বসলেন। তাঁর ন্যায় একজন ধার্মিক ও তারেকে দুনিয়া ব্যক্তির এতদুর বিনয় দেখে উপস্থিত সকলেই অবাক হয়ে গেলেন।
একদা লোকে ইব্রাহিমকে জিজ্ঞাসা করলো,” আল্লাহতায়ালার পক্ষ হতে মানুষের মনে পর্দা পড়ে কেন?” উত্তরে তিনি বলেন,”আল্লাহতায়ারা যা ভালোবাসেনলোকে তা ভালোবাসে না এবং অস্থায়ী খেলাধুলায় মশগুল হয়ে মানুষ কায়েমী শান্তির স্থান ও জিনিসকে ছেড়ে দেয়”!

এক ব্যাক্তি ইব্রাহিমের কাছে উপদেশ চাইলো। তিনি বলেন, “শুধু আল্লাহকেই বন্ধু বলে মেনো এবং অন্য সকলকে ত্যাগ কোরো।” অন্য এক ব্যাক্তি উপদেশ চাইলে তিনি বলেন,” বন্ধকে মুক্ত করো এবং মুক্তকে বন্ধ করো। সে জাসতে চাইলো এর অর্থ কিতিনি বলেন,” বন্ধ মুদ্রার থলি দান করো এবং অযথা কথায় ভারী জিহ্বাকে বন্ধ করো এক ব্যাক্তি ইব্রাহিমের নিকট এসে আরয করলো,” আমি অনেক দুষ্কর্ম করেছিআমাকে এমন কতকগুলি উপদেশ দান করেনযা আমাকে সত্যের সন্ধান দেবে!” তিনি বলেন,” যদি গ্রহন করো তবে ছয়টি উপদেশ দান করছি।(১) যদি গোনাহ করোতবে আল্লাহর দেয়া রুযী খেয়ো না। ব্যাক্তি বল্লোতিনি যখন একমাত্র রিজিকদাতাতখন তাকে ব্যাতিত আর কার নিকট জীবিকা পাব?” ইব্রাহিম বলেন,” এটি কখনোই উচিৎ নয় যেযাঁর রুযী খাবেতাঁর অবাধ্য হবে। (২) যখন কোন গোনাহ করতে চাওতখন তাঁর রাজ্যের বাইরে যেয়ে করবে। সে বল্লো,” যখন পূর্বপশ্চিমউত্তরদক্ষিণ সর্বত্রই কাঁর রাজত্ব বিস্তৃততখন সেই রাজ্য ছেড়ে অন্য কোথায় যাব?” তিনি বলেনএটা উচিৎ নয় যেযাঁর রাজ্যে বসবাস করবেতার বিরুদ্ধাচরণ করবে। (৩) যখন কোন গোনাহ করতে চাওএমন স্থানে গিয়ে করবেযেখানে তিনি তোমাকে না দেখেন। সে বল্লোতিনি তো সর্বত্রই বিরাজমানএবং সবই দেখেন। তিনি বলেন,”এটা উচিৎ নয় যেযাঁর রুযী খাবে এবং যাঁর রাজ্যে বসবাস করবে,তাঁর সম্মুখেই গোনাহ করবে। (৪) যখন আজরাইল (আঃ) তোমার প্রাণ হরণ করতে আসবেনতখন তওবার জন্য তাঁর কাছে সময় চেয়ে নেবে।সে বল্লো,” আযরাইল ফেরেশতা আমার কথা গ্রাহ্য করবে না। ইব্রাহিম বলেন,” যখন তুমি মৃত্যুকে বাঁধা দিতে অক্ষমতখন এই মুহুর্তকেই মুল্যবান মনে করা তোমার কর্তব্য এবং আযরাই (আঃ) আসার আগেই তোমার তওবা করা উচাৎ।(৫) মৃত্যুর পরে যখন কবরে মুনকার-নকীর সওয়াল জবাবের জন্য আসবেনতখন তুমি তাঁদেরকে তাড়িয়ে দেবে। সে বল্লো,” আমি তা করতে সম্পুর্ণ অক্ষম। ইব্রাহিম বলেন, “তাহলে তাঁদের সওয়াল জবাবের জন্য প্রস্তুত থেকো।” (৬) কেয়ামতের মাঠে যখন খোদাতায়ালা হুকুম করবেন যেগোনাহগারদিগকে দোযথে নিয়ে যাওতখন তুমি বলবে যেআমি যাব না। সে বল্লো,” ফেরেশতাগণ আমাকে জোরপূর্বক আমাকে নিয়ে যাবে। ইব্রাহিম বলেন,” তবে গোনাহ কোরো না। এই সকল কথা শুনে সে বল্লো,” এ-ই আমার জন্য যথেষ্ট!তখনই সে তওবা করলো এবং আমৃত্যু তাতে কায়েম ছিল।
একদা লোকে ইব্রাহিমকে জিজ্ঞাসা করলো,” আমরা খোদার দরবারে এত মোনাজাত করিঅথচ তিনি কবুল করেন না কেনএর কারণ কি?” ইব্রাহিম বলেন, ” এর কারণ শুন। খোদাতায়ালাকে তোমরা খুব চিন এবং জানঅথচ তাঁর হুকুম পালন করো নারাসুলুল্লাহকে জান এবং বিশ্বাস করোঅথচ তাঁর তাবেদারি করো না। কোরআন শরীফ পড়অথচ তাঁর উপরে আমল করো না। খোদাতায়ালার নেয়ামত সমুহ ভোগ করোঅথচ তাঁর নিকট শোকরগুজারী করো না। নেক্কারদের জন্যই বেহেস্ত প্রস্তুত বলে জানতথাপি তার তালাশ করো না। তোমরা এ-ও জানো যেগোনাহগারদের জন্যই দোযখের উপাদান প্রস্তুততথাপি তা হতে পরায়ন করো না। শয়তান তোমাদের পরম শত্রুএটি জেনেও তার সাথে তোমরা শত্রুতা কর নাবরং তার সাথে বন্ধুত্বই করে থাক। মৃত্যু যে অবশ্যম্ভাবীসেটা জনোঅথচ তার জন্য প্রস্তুতী নাও না। মা-বাবাসন্তানাদিকে মাটিতে কবর দিয়ে আসছকিন্তু তা হতে ইবরত (শিক্ষা) গ্রহন করছ না। নিজের কু-স্বভাবকু-বৃত্তি ইত্যাদি দোষ সমুহ ত্যাগ করছো নাঅথচ পরের দোষ খুঁজে বেড়াচ্ছ। এখন বলতোযারা এতগুলি পাপে মশগুলতাদের দোয়া কিভাবে কবুল হবে?”.।ইব্রাহিম আদহাম বলেন,”একবার আমি খোদার উপরে ভরসা করে জঙ্গলে রওনা হই।তিন দিন যাবৎ আমার খাদ্য জুটলো না। শয়তান এসে বল্রোবলখের বাদশাহী ছেড়ে এখন ক্ষুধায় মরছ! বাদশাহী থাকলে আজ কি সুন্দর আড়ম্বর করে চলতে ও সুখাদ্য খেতে। এই কথা শুনিয়া আমি মুনাজাত করলামহে পরওয়ারদিগার! তোমার দোশ্তকে কষ্ট দেয়ার জন্য কি দুশমনকে তার কাছে পাঠানো উচিৎঅমনি গায়েব হতে আওয়াজ আসলোহে ইব্রাহিম! যাহা কিছু তোমার পকেটে আছেতা ফেলে দাও! দেখবে যে যা দেখ নাইতা যাহির হয়ে যাবে! ভুল ক্রমে যে রৌপ্য মুদ্রাটি আমার পকেটে ছিল উহা আমি দুরে ফেলে দিলাম। তখনই শয়তান পালিয়ে গেল এবং সেদিন থেকেই এক অজ্ঞাত স্থান হতে আমার রুযী আসতে লাগল।

ইব্রাহিম বলেনএকদা আমি কোন এক বাগানের পাহারাদার নিযুক্ত হয়েছিলাম। একদিন বাগানের মালিক এসে আমাকে হুকুম করল,” কতগুলি মিষ্ট ডালিম আন। তাঁর কথা মত আমি কতগুলো ডালিম তার সামনে হাজির করি। তিনি তা খেয়ে বলেন, “এগুলো বড়ই টকতুমি টক – মিষ্ট ডালিমের পার্থক্য বোঝ না?” উত্তরে আমি বল্রাম,”আপনি আমাকে বগানের রক্ষক নিযুক্ত করেছেনফল খাবার জন্য নয়। মালিক বলেন,” তোমার মধ্যে যে পবিত্রতা দেখছিতাতে তোমাকে ইব্রাহিম আদহাম বলেই মনে হয়।” এই কথা শুনে আমি সেই বাগানের চাকুরী ত্যাগ করে চলে যাই।
তিনি এও বলেন,” একদা আমি হযরত জিবরাইল (আঃ) কে স্বপ্নে দেখি। তাঁর নিকটে একখানা কেতাব ছিল। আমি জিজ্ঞাসা করলামএটি কি এবং এটির দ্বারা কি করবেন?” তিনি বল্রেন,” এই কেতাবে খোদাতায়ালার দোস্তদের নাম লিখতে যাচ্ছি।” আমি বল্লাম,” আমার নামও লিখবেন কি?” তিনি উত্তর করলেন,” নাতুমি খোদার দোস্ত নও। আমি বল্লাম,” আমি তো খোদার দোস্তোগণের দোস্ত বটে!” এটি শুনে জিবরাইল (আঃ) কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তৎপর বল্লেন,” সর্ব প্রথমে তোমার নাম লিখবার জন্য আল্লাহতায়ালার হুকুম পেয়েছি।” ইব্রাহিম বলেন,” একদা রাত্রীকালে আমি বায়তুল মেকাদ্দাস মসজিদে ছিলাম এবং চাটাইয়ের ভিতরে নিজেকে লুকিয়ে রেখেছিলাম। কারণ মসজিদের খাদেম সেখানে কাওকে রাত কাটাতে দিত না। খাদেম যথাসময়ে দরজা বন্ধ করে দিয়ে চলে গেল। গভীর রাতে হঠাঃ দরজা খুলে গেল এবং খেরকা পরা এক বৃদ্ধ ও তাঁর সাথে আরো ৪০ জন খেরকা পরা ব্যক্তি সমজিদের ভিতরে ঢুকে দুই রাকাত নামাজ আদায় করলেন। তারপর মেহরাবের দিকে পিট দিয়ে বৃদ্ধ লোকটি সকলের দিকে মুখ করে বসলেন। কথা প্রসঙ্গে তাঁদের মধ্য হতে এক ব্যক্তি বল্লেন,” আজ এই মসজিদে আমারা ছাড়াও অন্য আর একজন লোকও আছেন। বৃদ্ধ মৃদু হেসে বল্রেন,” হ্যাআদহামের পুত্র ইব্রাহিম! আজ ৪০ দিন যাবৎ তিনি এবাদতে স্বাদ পাচ্ছেন না!” ইব্রাহিম বলেন,” আমি ইহা শুনে বের হয়ে আসলাম এবং বৃদ্ধকে বল্লামআপনি যা বল্লেন তা সম্পুর্ণ সত্যএর কারণ জানতে পাররে কৃতার্থ হতাম।” বৃদ্ধ বল্রেন,” তুমি অমুক দিন বসরা নগরে খেজুর ক্রয় করেছিলে।

 দেকানদার যখন খেজুর ওজন করছিলতখন একটি খেজুর নিচে পড়ে যায়তুমি ভুলে সেটি তোমারই প্রাপ্য ভেবে কুড়িয়ে নিয়ে ভক্ষণ কর। এ কারণেই তুমি এবাদতে স্বাদ পাচ্ছ না। ইব্রাহিম বলেন,” এটি শুনে আমি পরদিন ভোর বেলা বসরার দিকে রওনা হই। খেজুর বিক্রেতার নিকট মাফ চাই। দোকানদার সমস্ত ঘটনা শুনে বল্লো,” পরের ধন হরণ করা যখন এতই গুরুতরতখন আমি অদ্য হতে খেজুর বিক্রয়ের ব্যবসা ত্যাগ করলাম” তৎপর তিনি ইব্রাহিমের নিকট তওবা করে এবাদতে মশগুল হন এবং পরে তিনি আওলিয়া শ্রেনীভুক্ত হয়েছিলেন।

একদা ময়দান দিয়ে যাবার সময় জনৈক সেপাহি ইব্রাহিমকে জিজ্ঞাসা করল,” তুমি কে”? তিনি উত্তর করলেন,” একজন দাস। সিপাহি জিজ্ঞাসা করল,”বাসস্থান কোথায়?” তিনি কবরস্থানের দিকে ইঙ্গিত করে বল্লেন, “ঐদিকে!” সৈনিক রাগ হয়ে বল্লো, “তুমি আমাকে উপহাস করছ?” এ কথা বলে সেপাহি ইব্রাহিমকে বেত্রাঘাত করতে করতে গলায় দড়ি বেঁধে টেনে নিয়ে যেতে লাগল। লোকে বল্লো,”ওহে মুর্খ! ইনি ইব্রাহিম আদহাম। কেন তুমি তাঁকে মারছসেপাহী তাঁর নাম শুনেই তাঁর পায়ে পড়ে মাফ চাইল। ইব্রাহিম বল্লেনতুমি আমার প্রতি যে ব্যবহার করেছতার জন্য আমি তোমাকে দোয়া করিকেননা তোমার এই ব্যবহার আমার জন্য বেহেস্তের কারণ হলো।তোমার ভাগ্যে দোযখ হোককখনো আমি এই ইচ্ছা করি না। সেপাহি বল্লো,” আচ্ছাআমি যখন আপনার নাম ও বাসস্থানের কথা জিজ্ঞাসা করলামতখন আপনি এমন উত্তর কেন করলেন?” ইব্রাহিম বলেনসকল মানুষই আল্লাহর দাস এবং কবর আবাদ হচ্ছেনগর ধ্বংস হচ্ছে-অর্থাৎ নগরের লোক মৃত্যুর পর কবরস্থানে যেয়ে বসতি স্থাপন করছে। সুতরাং সেটাই সকলের স্থায়ী বাসস্থান।

একদা জনৈক মাতালের নিকট দিয়ে যাবার সময় তিনি দেখলেন যেমাটি লেগে তার মুখ বিশ্রী হয়ে রয়েছে। মাতালের এই অবস্থা দেখে ইব্রাহিম তখনই পানি এনে তাঁর মুখ ধুইয়ে দিলেন এবং বল্লেন,” যে মুখ খোদার পবিত্র নাম জপবার স্থানসেখানে মাটি লাগিয়েখারাপ করে রেখেছো কেন?” এই বলে তিনি সেস্থান হতে চলে গেলেন। পরে মাতালের হুঁশ হলে লোকে তাকে বল্লো,” ইব্রাহিম আদহাম তোমার মুখ ধুইয়ে দিয়ে এই কথা গুলি বলে গেছেন। মাতাল তৎক্ষনাৎ বল্লো,” আমিও অদ্য হতে তওবা করলামআর কখনো মদ্যপান করব না।” সেই রাত্রেই ইব্রাহিম স্বপ্নে দেখলেনআল্লাহতায়ালা বলছেনহে ইব্রাহিম! তুমি আমার সন্তুষ্টির জন্য এই মাতালের মুখ ধুয়ে দিয়েছএর বদলে আমি তোমার অন্তর ধৌত করে দিলাম!

একদা ইব্রাহিম জনৈক দরবেশসহ এক পাহাড়ে বসে কথোপকথন করছিলেন। এমন সময় সেই দরবেশ ইব্রাহিমকে জিজ্ঞাসা করলেন,” আচ্ছামানুষ কামেল (পুর্ণ) হবার পরিচয় কি?” উত্তরে তিনি বল্লেন,” যদি সে পাহাড়কে বলে `চল`, তখনই পাহাড় চলবে আশ্চর্য্যের বিষয় যে সেই মুহুর্তেই পাহাড়াটি চলতে আরম্ভ করল। ইব্রাহিম বল্লেন,” হে পাহাড়! আমি তোমাকে চলতে আদেশ করি নাই। আমি শুধু উদাহরণ স্বরুপ উহা বলেছি।” বালা বাহুল্যপাহাড় তখন থেমে যায়এইভাবে কঠিন সাধনা কিংবা ত্যাগ অথবা রেয়াযতের মাধ্যমে কামেল মোকাম্মেল ওলীগনের ওছিলায় একজন সাধারন মানুষ আল্লাহর রঙ্গে রঙ্গিন হয়ে আল্লাহর ওলী কিংবা আল্লাহর বন্দুতে রুপ নেয়,

Comments

Popular posts from this blog

হযরত আলাউদ্দিন আহমদ সাবের কালিয়ার (র) বড় পীরের পর সবচেয়ে জালালি ফায়েজের আউলিয়া।।

নবী প্রেমের ৪১টি পুষ্প!! কিছু গুরুত্বপূর্ণ দরূদ শরীফ ও তার ফজিলত।।

হযরত শাহ আলী বোগদাদী (রহঃ)